ঈশা অন্ত:সত্ত্বা ছিল তবে বিয়েটা হয়েছিল

0
10

প্রথম দেখাতেই ঈশাকে বিয়ের প্রস্তাব দেই। শুধু তাই নয়, ঈশা তখন অন্ত:সত্ত্বা ছিল। তবে বিয়েটা হয়েছিল তার সন্তান প্রসব হওয়ার পরেই। বিয়ের প্রস্তাবটা যে আমি তার প্রেমে পড়ে, কিংবা রুপে মুগ্ধ হয়ে দিয়েছিলাম ঠিক তা না। তার জীবন বাঁচাতে গিয়ে আমার বিয়েটা করতে হয়েছিল। ঘটনাটা পরিষ্কার বোঝাতে গেলে আপনাদেরকে একটু অতীতে নিয়ে যেতে হবে।

 

সেদিন রাতে আমি স্টেশনে বসে সিগারেট ফুঁকছিলাম। রাত আনুমানিক এগারোটার মতো বাজে। মাঝে মাঝেই মন খারাপ হলেই স্টেশনে একা একা বসে সিগারেট টানা আমার পুরোনো অভ্যাস ছিল। সেদিনের মন খারাপের কারণ ছিল আমার পুরনো গার্লফ্রেন্ড রিতুর সাথে ব্রেকআপ। তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল প্রায় ২বছর। আমি তখনো চাকরি-বাকরি কিছু করি না। যে জন্য রিতুর অনেক শখ আল্লাদ আমি পূরণ করতে পানি নাই। রিকশায় চড়ে রাতের নিয়ন আলোর রোডে গল্প করা। সিনেমাহলে গিয়ে একসাথে সিনেমা দেখা। কিংবা নামীদামী রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার করার মতো ঘটনা খুব কমই ঘটতো আমাদের প্রেমে স্থান পায় অর্থ অভাবে। তবে হ্যাঁ আমি দুটো টিউশনি করাতাম, এটা দিয়েই আমার পড়ার খরচ চালাতাম। মেসে রুম শেয়ার করে আলুভর্তা আর পাতলা ডাল খেয়ে কাটিয়ে দিতাম। কখনো কখনো টিউশনি তে হেঁটে গিয়ে, এক বেলার খাবার না খেয়ে মাস শেষে কিছু টাকা জমাতাম। খুব বেশি টাকা যে হতো তা না। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে রিতুকে হরেক রঙের কাচের চুড়ি, কালো টিপের পাতা, আলতার কৌটা কিনে দিতাম। কখনো ডাইরি কিনে সেখানে নিজেই কবিতা লিখে রিতুকে উপহার দিতাম। তবে আমার এসব সস্তামানের উপহার সে খুব বেশি খুশি না বুঝতে পারতাম আমি। সে চাইতো তাকে নিয়ে বড় বড় শপিং মলে যাই, দামী ড্রেস কিনে দেই। স্বর্ণমন্ডিত গহনা উপহার দেই। জন্মদিনে কয়েক পাউন্ডের বড়সড় কেক উপহার দেই। আর্থিক দুর্বলতার কারণে আমার পক্ষে তার এসব উচুমানের শখ পূরণ করা সম্ভব হয়নি কখন। সেদিন দেখলাম, তার ক্লাসমেট রুপমের সাথে সে বাইকে করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরদিন জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, আমার মতো থার্ডক্লাস আর মেসে থেকে সস্তা ডাল-ভাত খাওয়া ছেলের সাথে সে আর থাকতে চাচ্ছে না। আমি অনেক বুঝানর চেষ্টা করলাম, তার হাত ধরে কাঁদলাম। কিন্তু সে আমার কথা রাখলো না। সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করে চলে গেল। তারসাথে কন্টাক্ট করার অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না। একটা সিগারেট শেষ করে অন্যএকটা ধরাতে যাবো ঠিক তখনি দেখলাম একটা মেয়ে রেললাইনের মাঝে দাড়িয়ে আছে। অপরদিকে ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে। কোনো রকম দৌড়ে গিয়ে তাকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচালাম। খেয়াল করলাম মেয়েটা অন্ত:সত্ত্বা। তারপর মেয়েটি এক রকম চিৎকার করে বললো।

আপনি আমায় বাঁচালেন কেন?

বাঁচালাম কেন মানে, একজন মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে কিভাবে মরতে দিতে পারি কিভেবে ?

আমার এই জীবন রাখার চাইতে মরে যাওয়া ভালো, কথাটা শুনে চমকে গেলাম। যদিও আমি আপনার পরিচিত কেউ না তবুও আমি আপনার আত্মহত্যার কারণটা জানতে চাচ্ছি ? মেয়েটি কিছুক্ষন চুপ হয়ে থাকলো। তারপর বলে কি লাভ? আপনি কি পারবেন, আমার সমস্যার সমাধান করতে? তবুও সাহস করে বললাম আগে তো বলুন, হয়তো সমাধান করতে ও পারি? তারপর মেয়েটা বলতে শুরু করলো আমার নাম ঈশা। আমি ইংরেজিতে অনার্স করছি। রাব্বি নামের একটা ছেলের সাথে আমার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আমি তাকে খুব বেশিই ভালোবাসতাম। কিন্তু সে শুধুমাত্র আমার দেহটাকেই ভালোবাসতো। প্রেমের তিন মাস পর একদিন সে আমায় তার সাথে রুম ডেটে যেতে বললো। তার সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে বলল। আমি প্রথমে রাজি হলাম না। তারপরও সে আমায় নানা ধরণের ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করলো। মন থেকে ভালোবাসলে শরীর দিতে সমস্যা কি ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন সে বলেই ফেললো, যে আমি যদি তারসাথে শারীরিক সম্পর্কে না যাই তবে সে আমার সাথে সম্পর্কই রাখবে না। আমি তাকে খুব বেশিই ভালোবাসতাম। তাকে হারানোর ভয়ে তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। তারপর থেকে সে প্রায়ই এরকম ভয় দেখিয়ে তার সকল ইচ্ছে আমার দ্বারা হাসিল করতো। একদিন ফোনে বললাম আমি তার সন্তানের মা হতে চলেছি, সে যেন দ্রুত আমায় বিয়ে করে। একথা শুনে রাব্বি বলে আমায় সে কোনভাবেই বিয়ে করতে পারবে না। আমার সাথে তার নাকি কোনো সম্পর্কই নেই। যা ছিলো সব নাকি টাইমপাস। কথাটা শুনে চোখে মুখে যেন অন্ধকার দেখতে লাগলাম। খুব কাঁদলাম, রাব্বিকে অনেক বুঝালাম কিন্তু সে বুঝলো না। তারপর থেকে তার ফোন ও বন্ধ পাচ্ছি। কিছু বুঝতে পারছিলাম না কি করবো? কাকে বলবো? আমি হোস্টেলে থাকতাম। এক পর্যায়ে আমার শরীরে গর্ভবতীজনিত লক্ষণ দেখা দিলে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। হোস্টেল কতৃপক্ষ আমায় হোস্টেল থেকে বহিস্কার করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। বাসার ফেরার পর আমার শারীরিক অবস্থা দেখে আম্মু-আব্বু কারোরি কিছু বোঝার বাকি রইলো না। সব বলতে হলো,সব শুনার পর আম্মু-আব্বু বললেন এবোরশন করে যাতে বাচ্চা নষ্ট করে দেই। আমি রাজি হলাম না। কেন রাজি হবো? পাপ করেছি আমি আমরা, কষ্ট পেতে হলে আমি পাবো। মরতে হলে আমি মরবো। বাচ্চাটার তো কোনো দোষ নেই। সে তো পবিত্র। বৈধ-নাকি অবৈধ ভাবে তার শরিরে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে সেটাতো তার জানার কথা না। তবে তার কেন শরিরের রক্ত- মাংসগুলো খন্ড-বিখন্ড করা হবে? আম্মু বললেন:- যদি বাচ্চাটা জন্মগ্রহন করে তবে কার পরিচয়ে সে বড় হবে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা ছিলো না আমার। বুঝতে পারছিলাম না কি করবো? সিদ্ধান্ত নিলাম বাচ্চা পেটে নিয়ে এক পাপ করেছি, এখন তাকে মেরে আরেকটা পাপ করবো? তারচেয়ে ভালো বাঁচতে হলে একসাথে বাঁচবো তা না হলে একসাথে মরবো। কারণ একটা নিষ্পাপ প্রাণ হত্যা করে অপরাধী হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া উত্তম হবে। তাই আজকে আত্মহত্যা করতে এসেছি। এবার বলুন আপনি পারবেন কি, আমার সমস্যার সমাধান করতে? পারবেন কি দুটো প্রাণকে রক্ষা করতে? সব শুনে আমি চুপ হয়ে রইলাম। হ্যাঁ..না কিছুই বলতে পারছি না। এত বর সিধান্ত নেবার মত ক্ষমতা আমার এখন হয়নি। শুধু চোখে জল টলমল করছে। ভাবছি, কতটা ভালোবাসলে একটা মেয়ে তার ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়ার জন্য নিজের অমূল্য সতীত্ব পর্যন্ত বিসর্জন দিতে দ্বিধা বোধ করে না। আর ঐ হারামীর জানয়ারের বাচ্চা কিনা তাকেই ফেলে চলে গেল। কিন্তু এখন মেয়েটার কি হবে? তার বাচ্চাটার কি হবে? একটা নিকৃষ্ট ছেলের জন্য দুটো প্রাণ আজকে বিসর্জিত হবে? আর আমি তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবো? হঠাৎ মেয়েটা খানিকটা রাগী গলায় বললো কি হলো পারবেন না তো, সমাধান দিতে? আমি জানতাম। আমাকে বাঁচানো আপনার একদম উচিত হয় নি।  আমি মরে গেলেই ভালো হতো। কথাটা বলেই মেয়েটা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। তারপর আমি হুট করেই তার হাতটা ধরে বললাম। আমায় বিয়ে করতে আপনার কোনো আপত্তি আছে ?

আমার মুখ থেকে এই কথাটা শুনার পর মেয়েটা থ হয়ে রইলো। হ্যাঁ.. না কিছুই যেন বলতে পারছে না। তারপর আমি আবার তাকে বললাম তবে হ্যাঁ, বিয়েটা আমি এখন করতে পারবো না। কারণ আমাদের ধর্মে অন্ত:সত্ত্বা কে বিয়ে করার নিয়ম নেই। বিয়েটা হবে আপনার সন্তান জন্মগ্রহন হওয়ার পর। আপনি রাজি? ঈশা তখনো চুপ হয়ে রইলো। অবশ্য চুপ হয়ে থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ, হুট করে কোথাকার কোন ছেলে তাকে বিয়ের কথা বলছে, যে তাকে চেনে না, জানে না। তার এই মুহূর্ত কি বলা উচিত সে হয়তো বুঝতে পারছে না। আমি আবার বললাম আমি জানি আপনি একজনকে বিশ্বাস করে ঠকেছেন। এই মূহুর্তে আমাকে বিশ্বাস করা আপনার জন্য খুব কঠিন। তবুও বলছি, শেষবারের মতো কাউকে বিশ্বাস করে দেখতে পারেন। এবার মেয়েটার চিন্তার ঘোর যেন খানিকটা কমলো। সে মিনমিন করে বলল  আত্মহত্যা করার জন্য আমি বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। এখন বাসায় ফিরবো কিভাবে? তাছাড়া মা- বাবাকেই বা কি বলবো? আমি বললাম আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে আমায় আপনার বাসায় নিয়ে চলুন। আমি আপনার মা-বাবাকে সব বুঝিয়ে বলবো। ঈশা আমাকে নিয়ে তার বাসায় গেলো। ঈশার আত্মহত্যা এবং তাকে বিয়ে করার ঘটনা আমি ঈশার মা- বাবাকে বুঝিয়ে বললাম। তারা কোনো অমত প্রকাশ করলেন না বরং খুশিই হলেন। অবশ্য এই অবস্থায় তাদের অন্যকোনো উপায়ও ছিলো না। সবশেষে আমি বললাম যে, বাচ্চা হওয়ার আগ পর্যন্ত ঈশা আপনার এখানে থাকুক। বাচ্চা হওয়ার পর সে খানিকটা সুস্থ হলে আমি তাকে বিয়ে করবো। আমার একথায় তারা খানিকটা অমত প্রকাশ করতে চাইলেও ঈশা না আবার আত্মহত্যা করে বসে সেই ভয়ে রাজি হলেন। অবৈধ ভাবে অন্ত:সত্ত্বা একটা মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে যে, আমি একটুও ভাবিনি ঠিক তা না। ভেবেছিলাম সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের নিয়ে। এই বিয়ের ঘটনা শুনার পর তারা নিশ্চয়ই মানুষ বলাবলি করবে, আমি কোথাকার কোন বেশ্যাকে বিয়ে করেছি কে জানে? তারা হয়তো ঈশার প্রসব করা সন্তানকে অপবিত্র বলে গালাগালি করবে এই সুশীল সমাজের মানুষেরা। তারা হয়তো বলবে, এমন পাপ যে করেছে তার মরে যাওয়াই ভালো ছিল, কেন তাকে বাঁচাতে গেলাম? কিন্ত তারা কি কখনো সেটা ভাববে। আত্মহত্যা করাও যে মহাপাপ। ঈশা তার এক পাপ মুছতে গিয়ে যে অন্য আরেকটা মহাপাপ করতে যাচ্ছিল। সে যে তার সাথে সাথে একটা নিষ্পাপ শিশুর পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত করতে যাচ্ছিল। সেটা কি তারা ভাববে? নাহ্ তারা সেটা কখনোই ভাববে না। মনকে খুব ভালো করে বুঝালাম ধুর, সুশীল সমাজের ভাবভাবি চুলোয় যাক। আমি যে দুটো প্রাণকে বাঁচাতে পেরেছি, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। ঈশাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি সেটা জানার বাকী রইলো আমার মা। সেদিন রাতেই আমি মাকে সব বলি। আমি জানতাম মা কখনোই এই ব্যাপারে আমায় না করবেন না। কারণ মনুষ্যত্বের শিক্ষা আমি আমার মা এর কাছ থেকেই পেয়েছি। সব শুনে মা বললেন:- কিন্তু সমাজের লোক কি বলবে? তারা তো উঠতে বসতে তোকে অপমান করবে। আমি বললাম, মা দুটো প্রাণ রক্ষা করার জন্য যদি অপমানিত হতে হয় হবো। সে অপমান আমি সহ্য করে নিতে পারবো। কিন্তু দুটো প্রাণ না বাঁচাতে পারলে নিজের মনুষ্যত্বের কাছে যতটুকু অপমানিত হতাম। সে অপমান সহ্য করার করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেন নি। কিছুদিন পরে ঈশার বাচ্চা হয়। সে সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পরই আমি তাকে বিয়ে করলাম। তারপর আমরা নতুন সংসার শুরু করলাম। ঈশা খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। আমাদের এই কষ্টের ফ্যামিলিতে এত্তো অভাব থাকার পরেও সে কোনোদিন কোনোরকম অভিযোগ করে নি। মাঝেমধ্যে মনে হয় বড় রকমের কোনো মহৎ কাজ করা ছাড়া তো সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে এত্তো বড় উপহার পাওয়া যায় না। আমি কি কখনো কোনো মহৎ কাজ করেছি ?

ঈশার মেয়ে, ভুল বললাম আমাদের মেয়ে “রাত্রীর” কদিন আগে দু বছর পূর্ণ হয়েছে। সে আমায় আব্বু বলে ডাকতে পারে। আহ্ কি মিষ্টি পবিত্র সেই ডাক। ডাকটা শুনার পর আমার মন আনন্দে ভরে যায়। তার ডাকে কোনোরকম অপবিত্রতার গন্ধ আমি পাই না। তবে সুশীল সমাজের লোকেদের কাছে যে মাঝেমধ্যে আমার অপমানিত হতে হয় না, ঠিক তা না। কিন্তু ঘরে ফিরে যখন ঈশাকে দেখি, রাত্রীকে দেখি। তাদের মুখে বেঁচে থাকার হাসি দেখি। তখন এসব অপমানিত হওয়ার কষ্টের ছিটেফোঁটাও মনে থাকে না। আর তখন মনে মনে বলি বেচেঁ থাকার চাইতে বড় কোনো আনন্দ কি পৃথিবীতে আছে? তাদের বাঁচাতে গিয়ে যদি আমার কোনো পাপও হয়ে থাকে, তবে সেটা হয়তো পবিত্র পাপ।

আপনার মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here