টাকা আনে টার্কী বিনিয়োগ ৩ মাসে ডাবল

0
32

বাংলাদেশে দ্রুত বিকাশমান টার্কী খামার। পশ্চিমা দেশগুলোতে টার্কি অধিক জনপ্রিয়। বছরে প্রায় ৩৫ লক্ষ টন টার্কি মাংস শুধুমাত্র আমেরিকায় উৎপন্ন হয়। সমগ্র ইউরোপে প্রায় ১৯.৮ লক্ষ টন টার্কি মাংস উৎপাদিত হয়। এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্যের মানুষ বছরে প্রায় ৫.৫ লক্ষ টন টার্কি মাংস খেয়ে করে থাকেন। বর্তমানে টাার্কি পালন করা হয় মার্কিন যুক্তরাস্ট্র, কানাডা , জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে।

টার্কির জাত টার্কিকে সুনির্দিষ্ট জাত অনুযায়ী ভাগ করা যায় না তবে এদের ৭টি আর্দশ জাত আছে যা মাংস উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত যেমন বেল্টসভিলি, ব্রোঞ্জ, বরবন রেড,ন্যারাগেনসেট,ব্লাক,শ্লেট,হোয়াইট হল্যান্ড।

এদের মধ্যে ব্রড ব্রেস্টেড হোয়াইট টার্কি ভারত সহ আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত ভাল একটি জাত।

টার্কি পাখির বয়স অনুযায়ী ওজন ডিম দেওয়া শুরু করে ৩০ সপ্তাহ থেকে গড়ে ডিমের ওজন প্রায় ৬৫/৭০ গ্রাম। বছরে ডিম উৎপাদন করে ৮০ থেকে ১০০ ট। ডিম থেকে ফুটে বাচ্চা বের হবার সময় ২৮ দিন। এক দিনের বাচ্চার ওজন প্রায় ৫০ গ্রাম। ২০ সপ্তাহে গড় ওজন (পুরুষ পাখি) ৭-৮ কেজি এবং (স্ত্রী পাখি) ৪-৫ কেজি। ডিম দেওয়ার সময়সীমা ২৪ সপ্তাহ পর্যন্ত। টার্কি পাখি বাজারজাত করার উপযুক্ত বয়স  ১৪-১৫ সপ্তাহ

সাধারণত ৩০ সপ্তাহ বয়স থেকে টার্কি ডিম দেয়া শুরু করে এবং পরর্বতী ২৪ সপ্তাহ পর্যন্ত একটানা ডিম দেয়। প্রায় ৭০% টার্কি বিকাল বেলায় ডিম পাড়ে। এদের ডিমের এক প্রান্ত সরু এবং শক্ত খোলসে আবৃত। টার্কির ডিমে প্রায় ১৩.২% প্রোটিন, ১১.৫% লিপিড, ১.৮% কার্বোহাইড্রেট, ০.৫% মিনারেল এবং প্রতি গ্রাম কুসুমে প্রায় ১৫.৬৬ হতে ২৩.৯৫ মিগ্রা কোলেস্টেরল বিদ্যমান থাকে। নানাবিধ কারণে টার্কির মাংস সাধারণভাবে ভোক্তার কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। টার্কির মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অন্যান্য পোল্ট্রির চেয়ে বেশী। এছাড়া ও টার্কি তৃণভোজী পাখি হওয়ায় এর মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু বলে বিবেচিত হয়েছে। টার্কি পালন মুক্ত এবং আবদ্ব উভয় অবস্থাতেই করা যায়।

মুক্ত চারণ পদ্বতিতে এক একর জমিতে ২২০-২৬ ০ টি প্রাপ্ত বয়স্ক টার্কি পালন করা যায়। প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক টার্কির জন্য কমপক্ষে ৩-৪ বর্গফুট জায়গা দরকার। চরে খাওয়ার সময় শিকারী জীবজন্তুর হাত থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাসস্থান ঠান্ডা রাখার জন্য গাছ লাগাতে হবে। চারণভূমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করতে হবে যার ফলে পরজীবী সংক্রমণের ঘটনা কম হতে সাহায্য করে। ৫০% খাদ্য খরচ কম হয়। তাই স্বল্প বিনিয়োগের দরকার হয়। খরচের তুলনায় লাভের হার বেশী। টার্কি খুব ভালভাবে আর্বজনা খুটেঁ খায় বলে এরা কেচোঁ, ছোট পোকামাকড়, শামুক,রান্নাঘরের বর্জ্য ও ইউপোকা খেতে পারে, যাতে প্রচুর প্রোটিন আছে যা খাবারের খরচকে ৫০ ভাগ কমিয়ে দেয়। চরে বেড়ানো পাখীদের পায়ের দুর্বলতা ও খোঁড়া হওয়া আটকাতে খাবারে ঝিনুকের খোসা মিশিয়ে সপ্তাহে ২৫০ গ্রাম হিসাবে ক্যালসিয়াম দিতে হবে। খাবারের খরচ কম করার জন্য শাকসবজির বর্জ্য অংশ দিয়ে খাবারের দশ শতাংশ পরিমাণ পূরণ করা যেতে পারে। মুক্ত চারণ ব্যবস্থায় পালিত টার্কির অভ্যন্তরীণ (গোলকৃমি) ও বাহ্য (ফাউল মাইট) পরজীবী সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশী।

আবদ্ব পদ্বতিতে টার্কি পালনে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, শিকারী প্রাণী থেকে সহজেই রক্ষা করা যায়। দেশের অপেক্ষাকৃত গরম এলাকায় ঘরগুলি লম্বালম্বি পূর্ব থেকে পশ্চিমে রাখতে হবে। অল্প বয়স্ক টার্কির ক্ষেএে পরস্পর ২টি বাসস্থানের দূরত্ব কমপক্ষে ২০ মিটার ব্যবধানে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক টার্কির জন্য ৫০-১০০ মিটার ব্যবধান রাখা ভালো। খোলা ঘরের প্রস্থ ৯ মিটারের বেশি হওয়া চলবে না। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ঘরের উচ্চতা ২.৭ থেকে ৩.৫ মিটারের মধ্যে হবে। বৃষ্টির ঝাপটা আটকাতে ঘরের চালা ১ মিটার বাড়িয়ে রাখা উচিৎ। ঘরের মেঝে নিরাপদ ও আর্দ্রতারোধক যেমন কংক্রিটের হওয়া উচিত।

লিটার ব্যবস্থাপনা এর মাধ্যমে টার্কির লিটার হিসেবে সহজলভ্য দ্রব্যাদি ব্যবহার করতে হবে। কাঠের ছোবড়া, কাঠোর গুড়াঁ, ধানের কুড়া, বালি ইত্যাদি।

শুরুতে ২ ইঞ্চি পুরু লিটার তৈরি করতে হয় এবং ধীরে ধীরে আরো লিটার যোগ করে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত করা যেতে পারে। লিটার সবসময় শুকনা রাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভেজা অংশ তুলে ফেলে পুনরায় শুকনা লিটার যোগ করতে হবে। টার্কির খাবার সরবরাহের জন্য ২ টি পদ্বতি ব্যবহার করা হয়। যেমন ম্যাশ ফিডিং ও পিলেট ফিডিং। টার্কি পাখির খাবারে শক্তি, আমিষ, ভিটামিন ও মিনারেল অন্যান্য পাখির তুলনায় বেশি লাগে। পুরুষ ও স্ত্রী টার্কির রেশনে আলাদা আলাদাভাবে তৈরি করতে হয়। মাটিতে খাবার সংগ্রহ বা সরবরাহ করা যাবে না। রেশন ধীরে ধীরে পরির্বতন করতে হয়। সব সময় অবিরাম পরিষ্কার পানি সরবরাহ করতে হবে। গ্রীষ্মকালে পানির সাথে স্যালাইন বা গ্লুকোজ দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে দিনের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা সময়ে টার্কিদের খাবার দিতে হবে। পায়ের দূর্বলতা এড়াতে দিনে ৩০-৪০ গ্রাম হারে ঝিনুকের গুড়ো দিতে হবে। নিবিড় পদ্বতিতে উৎু সধংয হিসাবে মোট খাদ্যের ৫০/৬০ ভাগ পর্যন্ত সবুজ খাবার দেওয়া। সব বয়সের টার্কির জন্য টাটকা সবুজ খাদ্য। এছাড়া খাবারের খরচ কম রাখার জন্য কচুরি পানা, কলমি শাক, সবুজ ঘাস কুচি করে টার্কিদের খাওয়ানো যেতে পারে।

টার্কি পাখির প্রচলিত সংক্রামক রোগের কারণ হিসাবে রয়েছে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। অসংক্রামক রোগের কারণ হল বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক বিষাক্ত পদার্থ, টক্সিন, নিম্নমানের খাদ্য, আবহাওয়া এবং পরিবেশ। টার্কি পাখির সাধারণ রোগগুলো হচ্ছে- রাণীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমা, এভিয়ান রাইনোট্রাকিয়াইটিস, রক্ত আমাশয়, হিমোরেজিক এন্টারাইটিস ভাইরাস, ফিতা কৃমি, গোল কৃমি, ব্লাক হেড, ফাউল পক্স, নেক্রোটিক এন্টারাইটিস, ফাউল কলেরা ইত্যাদি।

টার্কি পাখির মাংস পুষ্টিকর ও সুস্বাদু হওয়ায় এটি খাদ্য তালিকার একটি আদর্শ মাংস হতে পারে। পাশাপাশি দেশের বৃহক্তর জনগোষ্ঠীর মাংসের চাহিদা মেটাতে গুরুক্তপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যাদের অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত মাংস খাওয়া নিষেধ অথবা যারা নিজেরাই এড়িয়ে চলেন, কিংবা যারা গরু বা খাসীর মাংস খায় না, টার্কি তাদের জন্য হতে পারে বিকল্প। তাছাড়া বিয়ে, বৌ-ভাত, জন্মদিন সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খাসীর বা গরুর মাংসের বিকল্প হিসেবে টার্কির মাংস হতে পারে অতি উৎকৃষ্ট একটি খাবার এবং গরু বা খাসীর তুলনায় খরচ ও হবে কম।

বাংলাদেশে মুরগি পালনের পাশাপাশি আমিষের উৎস হিসাবে টার্কি পালনে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। টার্কি যেহেতু ব্রয়লার মুরগির চেয়ে দ্রুত বাড়ে তাই পরীক্ষামুলকভাবে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে কিছু কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই টার্কি পালন শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে পঞ্চগড় জেলায় সালাউদ্দিন মিয়া, দিনাজপুর জেলায় আজম সরদার, নওগাঁ জেলার ঝিল্লুর রহমান, ঢাকার উক্তর বাড্ডার মিরাজ হোসেন ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে  টার্কি পাখি পালন শুরু করেছেন । গ্রাম্য এলাকায় মুক্ত অথবা অর্ধমুক্ত অবস্থায় টার্কি পালন অত্যন্ত লাভজনক। মুক্ত অবস্থায় টার্কি পালনে অল্প পুজিঁতে সহজেই লাভজনকভাবে খামার গড়া যায়। তাছাড়া আমাদের দেশের আবহাওয়া টার্কি পালনের জন্য খুবই উপযুক্ত। 

আপনার মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here