বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ও বাংলাদেশ

0
53

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আরেকটি স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হলো বাংলাদেশের । ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাজীপুরের বেতবুনিয়া কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের যে বীজ বপন করেছিলেন, সে পথ ধরেই বাংলাদেশ আজ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক । বিশ্বের দুইশত দেশের মধ্যে মাত্র ৫৬টি দেশ মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট স্থাপনের অভিজাত ক্লাবের সদস্য। আজ বাংলাদেশ এ ক্লাবের ৫৭ তম সদস্য হিসাবে পরিচিতি অর্জন করেছে। এ স্যাটেলাইট বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। শুধু তাই নয়, সঠিক ব্যবহার ও বিপণনের মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের উপগ্রহ রয়েছে। যেমন:

  • ভূ-স্থির যোগাযোগ উপগ্রহ,
  • পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা উপগ্রহ,
  • মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা উপগ্রহ,
  • প্রযুক্তি উন্নয়ন উপগ্রহ,
  • অবস্থান নির্ণয় উপগ্রহ,
  • নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপগ্রহ ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ একটি ভূ-স্থির যোগাযোগ (Geostationary Communication) স্যাটেলাইট। এ থেকে মূলত তিন ধরনের সেবা পাওয়া যাবে-

  1. সম্প্রচার
  2. টেলিযোগাযোগ
  3. ডাটা কমিউনিকেশনস

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহার করে কম খরচে আরও বেশি সংখ্যক টেলিভিশন চ্যানেল দেখা যাবে। ভালো মানের ভিডিও দেখা যাবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০টি টিভি চ্যানেল সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের মালিকানাধীন স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ দেশীয় চ্যানেলগুলোর বিদেশ নির্ভরতা কমাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ দিয়ে বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলো তাদের দর্শক-শ্রোতাদের সেবা প্রদানের সুযোগ করে দিতে পারে। স্যাটেলাইটটিতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার আছে। যা থেকে ১৬০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া যাবে এবং এর অর্ধেক অর্থাৎ ২০টি ট্রান্সপন্ডারের ৮০০ মেগাহার্টজ নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে বাকিটা বিদেশী চ্যানেলগুলোর সেবা প্রদানের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভাবনা আছে।

সাধারণভাবে ইন্টারনেট সেবা সরবরাহকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানগুলো ইন্টারনেট সেবা দিতে এবং মোবাইল ফোন অপারেটররা তাদের ব্যাকহল ট্রান্সমিশনের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ ব্যবহার করে থাকে। তবে দুর্গম এলাকা এবং আপদকালীন বিকল্প হিসেবে স্যাটেলাইট অত্যাবশ্যকীয়। এজন্য সব অঞ্চলের জন্য ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তির সমান সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের সকল ইউনিয়নকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় নিয়ে আসা এ উদ্যোগের লক্ষ্যে। কিন্তু এসব ইউনিয়নের মধ্যে ৭৫০টি ইউনিয়ন দুর্গম এলাকায়। সাধারণত ডাটা সার্ভিসের জন্য অপটিক্যাল ফাইবারকে পছন্দের শীর্ষে রাখা হয়। তবে দুর্গম এলাকা বিশেষ করে দ্বীপ এবং পার্বত্য অঞ্চলে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল লাইন পৌঁছানো দুরূহ ও ব্যয়বহুল। সেখানে ইন্টারনেট লিঙ্কড যোগাযোগ ও ডাটা সার্ভিসের বিকল্প উপায় হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এছাড়াও জরুরী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ভূমিভিত্তিক যোগাযোগ সেবায় বিঘ্ন ঘটলে ডাটা ও টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে বাড়তি সুবিধা নেয়া যাবে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৗশলীরা যে জ্ঞান অর্জন করছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন তা আমাদের অমূল্য সম্পদ। আমরা আশা করতে পারি, সে দিনটি বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট তৈরি করতে সক্ষম হবেন এবং দেশের মাটিতেই তা তৈরি হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সব সময় আমাদের প্রথম স্যাটেলাইট হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে, এটি কোনভাবেই আমাদের শেষ স্যাটেলাইট হবে না। আমাদের আশা, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের উৎক্ষেপিত স্যাটেলাইট সিরিজে যুক্ত হবে নতুন এবং ভিন্ন ধর্মী আরও অনেক স্যাটেলাইট।

মহাকাশ ভ্রমণের প্রেরণাময়ী কাহিনী বিশেষ করে নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং-এর চন্দ্রাভিযান আমাদের স্কুলগুলোতে পড়ানো হয়। বিষয়টি এখনও বিস্ময় জাগায় আর মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের শিশুদের আরও বড় পরিসরে ভাবতে উৎসাহ জোগায়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ভবিষ্যতে সফল নভোচারী ও মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে নিরন্তর অনুপ্রেরণা জোগাবে।

আপনার মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here