সন্তান পেলাম বউকে আর পেলাম না

0
7

বাসর রাতেই বউকে তুই বলে ডাকলাম। বললাম তুই আমাকে আপনি করে ডাকবি। একদম কাছে আসার চেষ্টা কখনো করবিনা। কারণ আমার বউ ছিলো একদম কালো একদম কয়লার ড্রাম এর মত। একদম কুচকুচে কালো তার গায়ের রং। বাসরঘরে ঢুকে বিছানায় তাকিয়ে দেখি যেন ঠিক একটা কালো নিগ্রো মেয়ে বসে আছে লাল ঘোমটা দিয়ে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে, কপালে ঢ্যামা একটা টিপ দিয়েছে। একদম কি বিচ্ছিরি সাজ। ছি ছি।

লাল কালোয় কি এক অগোছালো সাজ। বাতি বন্ধ করতেই বুঝলাম যেন একটা আধার নিয়ে শুয়ে আছি। শুধুমাত্র যৌনতার দায় সারা হয়েছিল সেই রাতে। তারপর বিছানা থেকে তুলে দিয়েছিলাম তাকে। যৌতুক বিরোধী ছিল আমাদের পরিবার। তাই বাবার কথা ছিলো বিনা যৌতুকে নিজের আত্মীয়ের মধ্যে কারো মেয়েকে পুত্রবধু করে আনবেন তিনি। তাই হল। হাজারো অনিচ্ছা থাকা স্বত্তেও বাবার বন্ধুর কালো মেয়েকে বিয়ে করতে হল আমাকে। কলেজের সেরা সেলফি বয়ের এমন একট বউ জুটলো, যে জীবনে বউকে নিয়ে আর সেলফি তোলা যাবেনা। বন্ধুরা কত অনুরোধ করেছে বউ নিয়ে বেড়াতে যাইতে। কিন্তু আমি তাকে নিতামনা। লজ্জা বলে একটা কথা আছে তো নাকি। রাতে বাড়ি ফিরতাম দেরি করে। তখনো সে জেগে থাকত। রাতের খাবার বেড়ে দিত। তার সাথে  খুব প্রয়োজন ছাড়া তেমন কথা বলতাম না আমি। কিভাবে বলি, বারে, ডিস্কোতে সুন্দরী মেয়ে দেখে বাড়িতে কি এমন আলকাতরা মার্কা মেয়ে ভালোলাগে ?

ওর কি প্রয়োজন সেটা কোনদিন জিজ্ঞেস করিনি। বাড়িতে সবার কাপড় কেনা হয়, খাবার তো আছেই। আর কি চাই? এভাবেই কেটে গেল কয়েকমাস। সেদিন এক বন্ধু তার গার্লফ্রেন্ডকে গিফট দেয়ার জন্য মেয়েদের প্রসাধনী জাতিও কিছু কিনেছিল। সেটাও আবার আমাকেই পৌছে দিতে হবে। অনেক রাতে গিফট বক্স হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। দেখি সে সোফায় ঘুমিয়ে বসে বসে ঘুমিয়ে পরেছে। ভাবলাম খেয়েছে তো ? আবার ভাবলাম আমি না আসা পর্যন্ত আবার ওকে খেতে দেখিনি কোনদিন। শুয়ে পরলাম। কিন্তু মনটা বড় খচখচ করছে। ডেকে তুলে বললাম, খেয়ে তারপর শুবি। পরদিন সকালে গিফট বক্স খুজে দেখি ওটা আর আস্তনেই। ও ওটা খুলে ভিতরে যা ছিল রীতিমত ব্যবহার করা শুরু করে দিয়েছে। ওর খুশি মুখ দেখে কিছু বললাম না। বেচারী।

কালো বলে কি সাজতে নেই? নিজেই হেসেছিলাম সেদিন। তারপর নতুন করে গিফট কিনে পৌছে দিলাম আমার সেই বন্ধুর বান্ধবীর কাছে। তারপর একদিন ও বমি করলে বুঝলাম ও মা হতে চলেছে। এক শীতের বিকেলে বাবা মা বেড়াতে গেলেন গ্রামে। বাসায় রইলাম আমি আর সে। সে রাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলাম। কারণ বাড়ি পুরো একা। গ্রাম্য মেয়ে। বলা যায়না ভুতের ভয়টয় পায়নাকি। বাসায় ফিরে শুনলাম রান্না হয়নি।কারণ জানতে চাইলে ও বলল,ভেবেছিলাম আপনি বন্ধুদের সাথে খাবেন। দুপুরের কিছু ভাত ছিল। আমার হয়েযাবে। তাই  ফ্রিজ খুলে দেখলাম। সামান্যই কিছু ভাত আছে। বললাম চল কাপড় পরে নে এখন আমার সাথে আজকে হোটেলে খাবি। ও যেতে চাইছে না। আমিও রেখে যেতে পারতেছি না একা বাড়ি বলে। অবশেষে দুজনে বাহির হলাম। রাতের শহর ও যেন হা হয়ে দেখছিল। বললাম হাত ধর, নাহলে ভীড়ে আবার হারিয়ে যাবি। সেদিন প্রথম ও আমার সাথে বেড়িয়েছিলো, প্রথম আমার হাত ধরেছিল। ভালই লাগছিল। আমিও ওর আঙুল ধরেছিলাম যাতে ও হারিয়ে না যায়। আগেই সিখায় দিলাম হোটেলে আমাকে আপনি করে বলবিনা, তুমি করে বলবি আচ্ছা? মাথা নাড়ল। কিন্তু হোটেলে খাবার সময় ও একবারো আমায় ডাকেনি। উল্টো আমিই বলেছিলাম,তুমি আরো কিছু খাবে। সেদিন দেখি ওর ব্যাবহার করার স্নোর টিউব কেটে স্নো বাহির করছে। রেগে বললাম, স্নো শেষ হয়ে গেছে বলতে পারোনা ? সেদিনই সে প্রথম আমার কাছে শ্যাম্পু কিনে চেয়েছিল। আমি সেদিন ওকে নিয়ে মার্কেটে গেলাম কসমেটিকস কিনতে। বন্ধুরা অনেকেই দেখেছিল সেদিন কিন্তু সবাই ভাবি বলে যথেষ্ঠ রেসপেক্ট করেছিল। সবাই তিনদিন পর আড্ডাতে আসার জন্য অনুরোধ করছিলো ওকে। তিনদিন পর আমিই ওকে নিয়ে গেলাম মোটর সাইকেলে। ওর জীবনের প্রথম লংড্রাইভ আর ড্রাইভার হলাম আমি। আর আমার বউকে নিয়ে প্রথম। জীবনের প্রথম তার জন্য আজ খোদার দরবারে হাত তুলেছি আমি। সে যেন সুস্থ থাকে।কারণ আজ ও মা হবে। আমি হবো বাবা। জানিনা কোথাথেকে আজ এতো কান্না আসছিল আমার। হাঁসপাতালে ওর কাছে বারবার ছুটে যাচ্ছিলাম। ও হাতধরে যতবার বলেছিলো ওর খুব ভয় করছে, ততবারই বলেছি ভয় পেওনা আমি তোমার পাসেই সাথেই আছি। সেদিন ও কাউকে খুজেনি শুধু আমায় খুজেছে। আমায় পাশে থাকতে বলেছে বারবার। আর আমি, বারবার পর্দার ফাকে বারবার ওকে দেখতেছিলাম। সিজারে নেওয়া হয়েছিলো ওকে। সন্তান পেলাম। কিন্তু ওকে পেলাম না। ওর দেহটা ধরে সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। মনে হচ্ছিলো খুব যেন নিজের কলিজাটা ছিড়েগেছে। আজো ওর কবরের পাশে ছুটেযাই। চিৎকার করেরে বলি,ফিরে এসো তুমি, একটা রাত তোমারসাথে গল্প করা বাকিছিলো, একটা সেলফি তোমায় নিয়ে তোলার ছিল। জানি ওকে ভালবাসা দিতে পারিনি। কিন্তু আজ বুঝছি কেন এখনো বুকের বামপাশটা চিনচিন করে ব্যাথা করে।

আজ যাকে অবহেলা আগামীকাল তাকেই খুব ভালোবাসতে ইচছা করবে এটাই নিয়ম, কিন্তুু এই অবহেলায় যখন সে হারিয়ে যাবে তখন আর তাকে খুজে পাওয়া যাবেনা। ফরশা হলেই কি সুন্দর? আমরা তো ইংরেজদের গুলাম ছিলাম তাই ফরসা রং দেখলে গোলামী করতে ভালোবাসি। সুন্দর কে ? কালো মানেই কি অসুন্দর?জ্ঞানপাপী রাই আমাদের মাথায় ডুকিয়েছে সাদা মানেই সুন্দর। সাধারণ একটি অসুখে সাদা চামড়া নষ্ট হয়ে কালো হয়ে যেতে পারে কিন্তু সুন্দর মন কখনো নষ্ট হয় না।

আপনার মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here